ওসমান হাদি হত্যা: কে এই ‘মাস্টারমাইন্ড’ শাহীন?
গোয়েন্দা সংস্থার ভাষ্য অনুযায়ী, শহীদ ওসমান হাদির কিলিং মিশন বাস্তবায়নে অর্থ এবং অস্ত্রের জোগানদাতা ছিলেন শাহীন চেয়ারম্যান নিজেই। এছাড়া তার সহযোগী হিসেবে কিছু নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতার যোগও রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এই হত্যাকাণ্ডে শাহীন চেয়ারম্যান একা ছিলেন না। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও সহযোগিতায় ছিলেন আরও কয়েকজন ব্যক্তি। যাদের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। এরই মধ্যে কয়েকজন সন্দেহভাজনের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
শাহীন আহমেদ দীর্ঘদিন ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তবে তিনি মাফিয়া ডন হিসাবেই বেশি পরিচিত। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ছিলেন সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ডানহাত। চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং অস্ত্রধারী হিসেবে তার নাম পুলিশের খাতায় আরও আগেই থেকে তালিকাভুক্ত ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, বিপুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি ব্যাপক প্রভাব খাটিয়ে একাধিকবার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বহুবিধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠলেও শাহীন চেয়ারম্যান সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকের মতো শাহীন চেয়ারম্যানও সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান। প্রথম দিকে তিনি আত্মগোপনে থাকলেও গত কয়েক মাসে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, কয়েকটি হোয়াটসঅ্যাপ কল ও খুদেবার্তার সূত্র ধরে শাহীন চেয়ারম্যানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে পলাতক ছাত্রলীগ নেতা হামিদের সঙ্গে হত্যাকারীদের যোগাযোগের তথ্যও মিলেছে। ভারতে অবস্থানরত কয়েকটি গ্রুপ থেকে অ্যাপভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঢাকায় থাকা সহযোগীদের কাজ সমন্বয় করা হচ্ছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সব দিক বিবেচনায় নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে হাদি হত্যার তদন্ত চলছে। শিগগিরই এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীসহ সংশ্লিষ্টদের পরিচয় স্পষ্ট হবে।’
এদিকে শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করার পর ভারতে পালিয়ে যায় প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ। বর্তমানে সে দেশটির মহারাষ্ট্রে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, গুলি করে হত্যাচেষ্টার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই দেশ ছাড়ে মূল অভিযুক্ত ফয়সাল। পরিকল্পনা অনুযায়ী গায়েব করা হয় গুরুত্বপূর্ণ আলামতও।
তদন্তে জানা গেছে, তিনি বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে দেশে থাকা ‘স্লিপার সেল’-এর সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছিলেন।
গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গেলে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। গুলিটি তার মাথায় লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে হাদিকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাদির মরদেহ বহনকারী ফ্লাইটটি অবতরণ করে। ২০ ডিসেম্বর দুপুরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজ পড়ান হাদির বড়ো ভাই আবু বকর সিদ্দিক। এরপর শহীদ হাদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ এলাকায় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে দাফন করা হয়।