এই মহান মাসের প্রকৃত সুফল পেতে হলে রমজান শুরুর আগেই পরিকল্পিত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
প্রথমত, মানসিক ও আত্মিক প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রমজানকে একটি ইবাদতের মৌসুম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
وَمَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। রমজানে হঠাৎ করে দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল বা অধিক তিলাওয়াত শুরু করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে যায়। তাই আগে থেকেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায়, সুন্নত ও নফল নামাজের চর্চা, তাহাজ্জুদের অভ্যাস এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন তিলাওয়াত শুরু করা উচিত। এতে রমজানে ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হয়।
রমজানের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
তাই আগেই একটি তিলাওয়াত পরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে। পুরো মাসে অন্তত একবার কোরআন খতম করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, শারীরিক ও জীবনযাপনের প্রস্তুতি প্রয়োজন। ঘুম, খাবার ও কাজের সময়সূচি ধীরে ধীরে এমনভাবে সামঞ্জস্য করা উচিত, যাতে সাহরি ও তারাবির সঙ্গে শরীর সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। অতিরিক্ত খাদ্যাভ্যাস, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বা রাত জাগার অনিয়ম রমজানের ইবাদতে প্রভাব ফেলতে পারে। সংযমী ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনধারা আগে থেকেই গড়ে তোলা উত্তম।
চতুর্থত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রস্তুতিও রমজানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাকাত, সদকা ও ফিতরা আদায়ের পরিকল্পনা আগে থেকেই করা উচিত। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং অসহায় মানুষের খোঁজ নেওয়া এই মাসের বিশেষ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানে সবচেয়ে বেশি দানশীল হতেন । তাই আয়ের একটি অংশ গরিবদের জন্য নির্ধারণ করা রমজানের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
পঞ্চমত, গুনাহমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগ, অশালীন বিনোদন, পরনিন্দা, মিথ্যা ও সময় অপচয়ের অভ্যাস ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। কারণ রোজা শুধু খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকা নয়; বরং চোখ, কান, জিহ্বা ও হৃদয়কে গুনাহ থেকে সংযত রাখাই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ للهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
“যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার খাদ্য-পানীয় ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।” (বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারিবারিক প্রস্তুতি। পরিবারে রমজানের একটি ইবাদতমুখর পরিবেশ তৈরি করা উচিত। সন্তানদের রোজা, নামাজ ও কোরআনের প্রতি আগ্রহী করে তোলা, পারিবারিকভাবে ইফতার ও দোয়ার আয়োজন করা এবং ঘরে একটি আধ্যাত্মিক পরিবেশ গড়ে তোলা রমজানের বরকত বৃদ্ধি করে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, রমজান কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জীবনের পরিবর্তনের একটি সুযোগ। এই মাসে অর্জিত তাকওয়া, সংযম ও নৈতিকতা যদি বছরের বাকি সময়েও ধরে রাখা যায়, তবেই রমজানের প্রকৃত সফলতা অর্জিত হবে।
আবারও আমাদের সামনে রমজান আসছে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহামূল্যবান সুযোগ। তাই এখনই সময় প্রস্তুতি নেওয়ার, নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার এবং আল্লাহর দিকে নতুন করে ফিরে আসার।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের সঠিক মর্যাদা উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন এবং এ মাসকে আমাদের জীবনের পরিবর্তনের মাস হিসেবে কবুল করুন। আমিন।